ঢাকাTuesday , 25 August 2026
  1. অর্থনীতি
  2. আইন-আদালত
  3. আন্তর্জাতিক
  4. ইসলাম
  5. কর্পোরেট
  6. কর্মখালি
  7. ক্রীড়াঙ্গন
  8. খাদ্য ও কৃষি
  9. গণমাধ্যম
  10. জাতীয়
  11. তথ্যপ্রযুক্তি
  12. দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা
  13. ধর্ম
  14. নারী ও শিশু
  15. পর্যটন
আজকের সর্বশেষ সবখবর

মাদক বন্ধ হবে কীভাবে—যখন মাদক ঘিরেই গড়ে উঠে অর্থনৈতিক স্বার্থের চক্র?

BD Voice 24
August 25, 2026 10:06 pm
Link Copied!

মাদক নিয়ে লিখতে গেলে আমি শুধু একজন নাগরিক হিসেবে লিখছি না; কক্সবাজারের মানুষ হিসেবে এর ভয়াবহতার একজন প্রত্যক্ষ সাক্ষী হিসেবেও লিখছি। মাদককে কেন্দ্র করে কত পরিবার ভেঙেছে, কত তরুণ বিপথে গেছে, অভিভাবকের কতশত স্বপ্ন অংকুরেই বিনষ্ট হয়েছে, কত তরুণীর হৃদয় ভেঙেছে।

কত সন্তান বাবা-মা হারা হয়েছে, কত অপরাধ সংঘটিত হয়েছে এবং এই ব্যবসার মাধ্যমে কত  মানুষ রাতারাতি আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়েছে—তার হিসাব নেই। মাদক শুধু একজন মানুষকে আসক্ত করে না; অনেক ক্ষেত্রে এটি চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি, সহিংসতা ও পারিবারিক অশান্তির সঙ্গে একটি জটিল দুষ্টচক্র তৈরি করে।

২০২০ সালে KYAMC Journal-এ প্রকাশিত “Common Drugs Abused by the Drug Addicted Young People in Bangladesh” শীর্ষক গবেষণায় ৪৯ জন মাদকাসক্ত তরুণকে নিয়ে গবেষণা করা হয়। এতে ৭৫.৫১ শতাংশ মাদক কেনার অর্থ পরিবার বা বাড়ি থেকে চুরি করে এবং ৫৩.০৬ শতাংশ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সংগ্রহের কথা জানিয়েছে। গবেষণায় চুরি, ছিনতাই, পকেটমার, ডাকাতি ও চাঁদাবাজির মতো কর্মকাণ্ডেরও উল্লেখ রয়েছে। অর্থাৎ প্রতিটি মাদকাসক্ত অপরাধী নয়, কিন্তু মাদকাসক্তি ও অপরাধের মধ্যে বাস্তব সম্পর্ক রয়েছে।

সাম্প্রতিক রংপুরের ঘটনাটি সেই ভয়াবহতারই একটি উদাহরণ। পুলিশের প্রাথমিক  ভাষ্য অনুযায়ী, ইয়াবা সেবনে আপত্তি করায় একই পরিবারের চার সদস্যকে হত্যার ঘটনায় দুই তরুণকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর আগে ২০২৫ সালে নরসিংদীতে পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, মাদকের টাকা না দেওয়ায় এক যুবক তার মাকে পিটিয়ে হত্যা করার অভিযোগে আটক হয়েছিলেন।

সীমান্তে পাহারা, তবু মাদক আসে কীভাবে?
বাংলাদেশে ইয়াবার প্রধান উৎস মিয়ানমার। বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত প্রায় ২৭১ কিলোমিটার। BGB, RAB, পুলিশ, কোস্ট গার্ডসহ বিভিন্ন সংস্থা নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছে এবং বিপুল পরিমাণ মাদক উদ্ধার করছে। অর্থাৎ মাদকবিরোধী অভিযান হচ্ছে না—এ কথা বলার সুযোগ নেই।
কিন্তু প্রশ্ন হলো—এত অভিযান ও বিপুল পরিমাণ মাদক উদ্ধারের পরও দেশের বাজারে মাদকের সরবরাহ বন্ধ হচ্ছে না কেন?

এই প্রশ্ন কোনো বাহিনী বা ব্যক্তিকে অভিযুক্ত করার জন্য নয়; এটি রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার কার্যকারিতা ও জবাবদিহির প্রশ্ন।

মাদক বন্ধ হচ্ছে না কেন?
সমস্যা শুধু সীমান্তে নয়। মাদক দেশে ঢোকার পর এর সঙ্গে যুক্ত হয় পরিবহন, মজুত, সরবরাহ, বিক্রি এবং বিপুল অর্থের লেনদেন। বিভিন্ন সময়ে সংবাদ অনুসন্ধান ও মামলায় কিছু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সদস্য, রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং বিভিন্ন পর্যায়ের সহযোগীদের বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসায় সম্পৃক্ততা বা পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগ প্রকাশিত হয়েছে।
এসব কোনো বাহিনী, পেশা বা প্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক চিত্র নয়। কিন্তু অভিযোগগুলো যদি বারবার সামনে আসে, তাহলে সেগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।

পুলিশের তথ্য সংগ্রহে সোর্স গুরুত্বপূর্ণ। তবে বিভিন্ন সময় এমন অভিযোগও শোনা যায় যে কিছু সোর্স নিজেরাই মাদককারবারিদের সঙ্গে যুক্ত বা স্বার্থের সম্পর্ক বজায় রাখে। এসব অভিযোগকে প্রমাণিত সত্য বলা যাবে না; কিন্তু সোর্স ব্যবস্থারও যথাযথ যাচাই ও জবাবদিহি থাকা জরুরি।

বিচারপ্রক্রিয়াতেও রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। প্রথম আলো-এর ২০ মাসব্যাপী অনুসন্ধানে ২০২৪ সালের মার্চ থেকে ২০২৫ সালের আগস্ট পর্যন্ত বিভিন্ন আদালতের ১,০৫৭টি মাদক মামলার রায়ের কপি সংগ্রহ করে ৫০০টি মামলা বিশ্লেষণ করা হয়। এতে ২৯৬টি মামলায় আসামিরা খালাস এবং ২০৪টিতে সাজা পান—অর্থাৎ ৫৯ শতাংশ মামলায় আসামিরা সাজা পাননি। দুর্বল তদন্ত, ত্রুটিপূর্ণ এজাহার ও জব্দতালিকা, সাক্ষ্য-সংকট, আলামত উপস্থাপনে ঘাটতি ও প্রসিকিউশনের দুর্বলতার মতো কারণও অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। এটি মাদক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার জন্য সতর্কসংকেত।

তাই প্রশ্ন হওয়া উচিত—শুধু বাহক ও খুচরা বিক্রেতারাই কেন ধরা পড়বে? মাদকের অর্থদাতা, মূল হোতা, পৃষ্ঠপোষক ও রক্ষাকারীরা কোথায়?

মাদকের টাকায় তৈরি হয় স্বার্থের চক্র
মাদক ব্যবসা অত্যন্ত লাভজনক অবৈধ অর্থনীতির অংশ। কক্সবাজারের বাস্তবতায় এর ভয়াবহতা আরও স্পষ্ট। এই ব্যবসার মাধ্যমে অল্প সময়ে বিপুল সম্পদের মালিক হওয়ার ঘটনা স্থানীয় মানুষের অজানা নয়।

মাদকের ভয়াবহতার শিকার কক্সবাজারে বেড়াতে আসা পর্যটকেরাও। পর্যটন এলাকায় ছিনতাই ও মাদকসংশ্লিষ্ট অপরাধের অভিযোগ শুধু পর্যটকের নিরাপত্তাই নয়, কক্সবাজারের পর্যটন ভাবমূর্তিকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে। তাই পর্যটন এলাকায় মাদক ও ছিনতাই প্রতিরোধে বিশেষ নজরদারি প্রয়োজন।

তাই মাদকবিরোধী অভিযানকে শুধু মাদক উদ্ধার ও আসামি গ্রেপ্তারের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। মাদকের সঙ্গে সঙ্গে মাদকের টাকাও অনুসরণ করতে হবে। কে অর্থ দিচ্ছে, কার কাছে যাচ্ছে, কার সম্পদ অস্বাভাবিকভাবে বাড়ছে এবং কারা একই চক্রকে সহায়তা করছে—এসব প্রশ্নের উত্তর প্রমাণের ভিত্তিতে খুঁজতে হবে।

সীমান্তে চাই বিশেষ দক্ষতা ও জবাবদিহি
আমার মনে হয়, বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী থেকে মাদকবিরোধী অভিযানে দক্ষ, সৎ, সাহসী ও প্রমাণিতভাবে তৎপর ৫০ জন কর্মকর্তাকে বাছাই করে গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত এলাকায় বিশেষ দায়িত্বে পদায়ন করা যেতে পারে। তাঁদের নিয়ে একটি আন্তঃসংস্থা বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করে উন্নত প্রযুক্তি, গোয়েন্দা তথ্য ও প্রয়োজনীয় জনবল দেওয়া যেতে পারে।

একই সঙ্গে সরকারি অন্যান্য দপ্তরে দায়িত্বে অবহেলার জন্য যেমন শোকজ, বিভাগীয় তদন্ত ও জবাবদিহির ব্যবস্থা রয়েছে, মাদকদ্রব্যের প্রবেশ, পাচার ও বিস্তার রোধে দায়িত্ব পালনে প্রমাণিত ব্যর্থতার ক্ষেত্রেও জবাবদিহি নিশ্চিত করা উচিত।
এটি কাউকে আগাম দোষী করা নয়; বরং দায়িত্বের সঙ্গে জবাবদিহি নিশ্চিত করা।

কী করা যেতে পারে?
মাদক নিয়ন্ত্রণে কয়েকটি পদক্ষেপ জরুরি—
ঝুঁকিপূর্ণ সীমান্ত পয়েন্টে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ও গোয়েন্দা কার্যক্রম জোরদার করা; বাহকের পাশাপাশি অর্থদাতা, মূল হোতা, সরবরাহকারী ও পৃষ্ঠপোষকদের শনাক্ত করা;
মাদক ব্যবসার অর্থের গতিপথ অনুসরণ করে আর্থিক তদন্ত জোরদার করা;

মাদক মামলার তদন্ত, জব্দতালিকা, আলামত সংরক্ষণ ও রাসায়নিক পরীক্ষায় ডিজিটাল ট্র্যাকিং চালু করা; সোর্স ব্যবস্থায় যাচাই ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা;
দায়িত্ব পালনে প্রমাণিত ব্যর্থতার ক্ষেত্রে বিভাগীয় জবাবদিহি নিশ্চিত করা;

মাদকাসক্তদের চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধন জোরদার করা।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরকে প্রয়োজনীয় জনবল ও লজিস্টিক সাপোর্ট দেওয়া এবং ব্যর্থতার ক্ষেত্রে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

কক্সবাজারের মানুষ হিসেবে মাদকের ভয়াবহতা খুব কাছ থেকে দেখেছি। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, মাদকের বিস্তার কার্যকরভাবে কমানো গেলে চুরি, ছিনতাই, ডাকাতিসহ মাদক-সম্পর্কিত বহু অপরাধও কমানো সম্ভব।

তাই মাদকবিরোধী লড়াইকে শুধু অভিযান হিসেবে নয়, জাতীয় নিরাপত্তা, জননিরাপত্তা ও সামাজিক সুরক্ষার বিষয় হিসেবে দেখতে হবে।

মাদক বন্ধে প্রয়োজন শুধু সীমান্তে পাহারা নয়—প্রয়োজন মাদকের অর্থের পথ অনুসরণ, সামাজিক আন্দোলন,  অপরাধী নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া, মাদক ব্যবস্থার প্রতিটি স্তরে কার্যকর জবাবদিহি এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও সদিচ্ছার দ্রুত বাস্তবায়ন।

লেখক:
মোহাম্মদ রাশেদুল হক রাসেল
সহকারী তথ্য অফিসার
সাবেক শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।